Posts Tagged ‘মে’

৫ মে, ১৯৭১

May 4, 2009

(প্রথম আলোতে প্রকাশিত আর্টিকেল অবলম্বনে)

এইদিনে
লালপুর চিনিকলে নির্মম গণহত্যা
ইমাম হাসান
৫ মে নাটোর লালপুরের নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সুগার মিল অবরোধের মাধ্যমে তৎকালীন প্রশাসকসহ ৪২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শতাধিক লোককে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর শহীদদের সমাধির সাক্ষী গণহত্যাস্থলের পুকুরটির নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ সাগর’। লালপুরবাসীর জন্য এটি একটি শোকাবহ স্নরণীয় দিন।
মুক্তিযুদ্ধের সুচনালগ্নে লালপুরে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৩০ মার্চ। ওই দিন লালপুরের ময়নায় পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সম্মুখযুদ্ধে সাঁওতাল তীরন্দাজসহ ৪০ জন বাঙালি শহীদ হন। পরদিন পাশের গমক্ষেত ও বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানি বাহিনীর নেতৃত্ব দানকরী মেজর রাজা আসলামসহ কয়েকজন ধরা পড়ে। পরে তাদের নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই সঙ্গে মুক্তিপাগল জনতা, ইপিআর ও আনসার বাহিনীর হাতে পর্যুদস্ত হয়ে ২৫ নম্বর পাঞ্জাব রেজিমেন্ট বিপর্যস্তু হয়ে পড়ে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সারা দেশে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নাটোর ক্যাম্পের মেজর শেরওয়ানি খানের আশ্বাসে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের তৎকালীন প্রশাসক আনোয়ারুল আজিম যথারীতি মিলের উৎপাদন অব্যাহত রাখেন। কিন্তু পাকিস্তানি মেজর তার ওয়াদার বরখেলাপ করেন। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী মিলের সবগুলো গেটে তালা লাগিয়ে অবরোধ করে অবাঙালিদের যোগসাজশে অর্ধশতাধিক বাঙালিকে শনাক্ত করে মিলের এক নম্বর গেটসংলগ্ন পুকুরঘাটে নিয়ে যায়। তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে লাশগুলো পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। ওই দিনই পাকিস্তানি বাহিনী গোপালপুর বাজার এলাকায় আরও ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করে।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞের নীরব সাক্ষী বুলেটবিদ্ধ হয়ে লাশের স্তুপের নিচে চাপা পড়েও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন ছয়জন। তাদের একজন বর্তমানে এই মিলের পাওয়ার হাউসের এসবিএ পদে কর্মরত খন্দকার জালাল আহমেদ। তিনি সেই বিভীষিকাময় ভয়াবহ দিনের স্নৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘একাত্তরের ৫ মে। আনুমানিক সকাল সাড়ে ১০টা। কাজ করছি। দুজন পাকিস্তানি সেনা আমার দুপাশে এসে দাঁড়াল। একজন পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে বলল, ইয়ে বাঙ্গালি, চলো, মিটিং হোগা, মিটিং মে চলো। এসময় মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা মঞ্জুর ইমাম নামে একজন অবাঙালি কর্মচারী বাঙালিদের শনাক্ত করে দিচ্ছিল। সেদিনের আক্রমণে মিলের কোনো অবাঙালি যাতে মারা না পড়ে সে জন্য তাদের সবার মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা ছিল। ইতিমধ্যে মিলের প্রশাসক আনোয়ারুল আজিমসহ অন্যদের বন্দি করা হয়েছে। একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তা আজিমকে লক্ষ্য করে বলে, কিসনে মেজর আসলামকে মারা হায়? তিনি বলেন, জানি না। পাকিস্তানি সেনারা তাঁকেসহ আমাদের অফিসারস কোয়ার্টারের পুকুরঘাটে নিয়ে গিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। তখনই বুঝতে পারলাম নিশ্চিত মারা যাচ্ছি। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘাতকদের অনেকগুলো স্বয়ংক্রিয় এলএমজি একসঙ্গে আমাদের ওপর গর্জে ওঠে। গগনবিদারী চিৎকারে আকাশ-বাতাসে আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে। মুহুর্তের মধ্যে পুকুরঘাট লাশের স্তুপে পরিণত হয়। তাজা রক্তে রঙিন হয়ে যায় পুকুরের পানি। আমার জ্ঞান ছিল না। আমি কীভাবে বাঁচলাম, বলতে পারব না।’
খন্দকার জালাল আহমেদ আরও বলেন, ‘একসময় জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখি আমার মাথাটা শানের ওপর এবং দেহের অর্ধেক অংশ রক্তে রঞ্জিত পানিতে ডুবে আছে। লাশের স্তুপের মধ্যে উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে জীবন্ত কাউকে খুঁজে ফিরছে আমার এক সহকর্মী মেহমান আলী। বুঝলাম তিনিই আমাকে লাশের স্তুপের মধ্য থেকে উদ্ধার করেছেন। বহু কষ্টে উঠে বসতেই দেখতে পেলাম পাশে পড়ে আছে ছোট ভাই মান্নানের লাশ। সেই বীভৎস দৃশ্যের কথা মনে হলে অজও শিউরে উঠি, গায়ে কাঁটা দিয়ে।’
এই গণহত্যায় শহীদদের কয়েকজন হলেন আনোয়ারুল আজিম, সহিদুল্লাহ, গোলজার হোসেন তালুকদার, সাইফুদ্দিন আহমদ, আবুল হোসেন, আবদুর রউফ, মান্নান ভুঁইয়া, গোলাম কিবরিয়া, নুরুল হক, আজহার আলী, মকবুল হোসেন, আবুল বাসার, মনসুর, রহমান, সাজেদুর রহমান, ইসমাইল হোসেন, হাবিবুর রহমান, মোসাদ্দারুল হক, মোকসেদুল আলম, আ. রহমান আমিন, মোহাম্মদ আলী, মোজাম্মেল হক, আবদুল মান্নান, ফিরোজ মিয়া, আক্তার উদ্দিন, সোহরাব আলী, আনোয়ারুল ইসলাম, পরেশ উল্লাহ, আ. মান্নান, কামাল উদ্দিন, আবুল কাসেম, আবদুর রব, শামসুল হক, আবদুল মজিদ, আবুল কালাম, নজরুল ইসলাম, আয়েজ উদ্দিন, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল, মোসলেম উদ্দিন, জহির উদ্দিন প্রমুখ। এ ছাড়া অন্য শহীদদের নাম পাওয়া যায়নি। সেদিন যাঁরা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন তাঁরা হলেন মেহমান আলী, নওসাদ আলী, খন্দকার ইমাদ উদ্দিন আহম্মেদ, আবদুল জলিল সিকদার, তোফাজ্জল হোসেন, আজের আলী প্রমুখ।
শহীদদের স্নৃতির উদ্দেশে শহীদ সাগর চত্বরে স্নৃতিসৌধ ও জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। ১৯৭৩ সালের ৫ মে মিলের প্রশাসক লে. আনোয়ারুল আজিমের স্ত্রী বেগম শামসুন্নাহার শহীদ সাগর চত্বরে স্নৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন। তাঁর নামানুসারে গোপালপুর রেলস্টেশনের নামকরণ হয় আজিমনগর স্টেশন।
২০০০ সাল থেকে এ দিনটিকে বাংলাদেশের চিনিকলসমূহের শহীদ দিবস হিসেবে দেশের সব কটি চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীরা পালন করছেন। প্রতিবছর শহীদদের অত্মীয়স্বজন, মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় লোকজন ৫ মে শহীদ সাগরে সমবেত হন।