পাঠক, আপনি কি শুনছেন?

পাঠক, ১৯৭১ সালে কী ঘটেছিলো আপনার জীবনে? মনে পড়ে? কোন জীর্ণ ডায়রিতে কি লিখে রাখার অবকাশ পেয়েছিলেন?

 

আমরা দেখিনি সেই দিনগুলি। আমরা জানি না আপনার বেদনার কথা, আপনার আনন্দের কথা, আপনার প্রাপ্তি আর ক্ষয়ের কথা। আমাদের জানান। এক একটা দিন ধরে যা কিছু ঘটেছিলো।

 

আপনার স্মৃতিচারণ এই ব্লগে উপাদান যোগ করবে। এর কাঠামোতে রক্ত আর মাংস যোগ করুন আপনি। এই ব্লগটি একটি জাতির একটি বছরের ডায়রি হয়ে বেড়ে উঠুক।

 

ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

Advertisements

One Response to “পাঠক, আপনি কি শুনছেন?”

  1. মতিউর রহমান Says:

    ঈশ্বরদীতে মুক্তিযুদ্ধ: ’৭১-এর অগ্নিঝরা মার্চ

    ’৭১-এর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর হঠাৎ করেই পূর্বপাকিস্তানের প্রশাসন পাল্টে গেল। সবকিছু চলতে লাগলো বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। শুরু হয়ে গেল ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার পালা। সেই উত্তাল দিনগুলিতে যুদ্ধপ্রস্তুতি ছড়িয়ে পড়লো সকল পাড়ায়, মহল্লায়, খেলার মাঠে, ক্লাবে, গ্রামে-গঞ্জে সর্বত্র। দিনের পর দিন হরতাল-অবরোধে দেশের সব স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আগে থেকেই অচল হয়ে পড়েছিল।

    আমাদের পাড়ার সিনিয়র ভাইদের মধ্যে আব্দুল মজিদ ফরাজি গ্রামের স্কুল মাঠে সকল তরুন-যুবকদের জড়ো হতে বললেন; সেই সাথে এও বললেন, প্রত্যেকে একটি করে থুৎনি সমান উচু বাঁশের লাঠি যেন সঙ্গে নিয়ে আসি।

    আমি নিজেই বাঁশঝাড়ে গিয়ে দেখেশুনে দা দিয়ে একটা লাঠি কেটে সেটিকে চেঁছে-ছিলে ঠিকঠাক করে নিয়ে রওয়ানা হলাম গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের মাঠে। প্রথমদিন বিকেল বেলা মাঠে প্রায় ৪০-৫০ জন তরুন জড়ো হলো। প্রথমবারের মত কিছুক্ষণ সামরিক কায়দায় লেফট-রাইট করে, বড় ভাইদের যুদ্ধপ্রস্তুতির বক্তৃতা শুনে, “পরে অস্ত্র দেয়া হবে” এই আশ্বাসে বলিয়ান হয়ে বীরের মত বুক ফুলিয়ে বাড়িতে ফিরলাম। চোখের ঘুম উধাও। আগামীকাল কী হবে সেই চিন্তায় ভেতরে অসীম উত্তজনা।

    সেদিন আমাদের কেউ কোনো কাজে নিষেধ করলো না। গ্রামের মুরুব্বিরা শুধু চেযে চেয়ে দেখলেন আমাদের কর্মকান্ড। না, আমাদের হাব-ভাব কেবলই যে হাস্যকর সেরকম কিছু ছিল না, সবাই গম্ভীর, দেশের জন্য কিছু একটা করতে হবে। কী করতে হবে সেটা তখনও অস্পষ্ট।

    এভাবেই চললো প্রায় সপ্তাহখানেক। ঈশ্বরদী থানা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের নেতৃত্বে আমরা ৫/৭ জনের একদল যুবক একটা খোলা জীপে সারাদিন শহরময় এমনকি গ্রামের পথে পথে স্বশস্ত্র টহল দিয়ে বেড়াই। কারো কারো হাতে বন্দুক।

    মার্চের ২৭/২৮ তারিখের দিকে একদিন বিকেলে শুনতে পেলাম ঈশ্বরদী বিমান বন্দরে ডিউটিরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটা ছোট দলকে ঘেরাও করে আটক করা হবে। আমরা কয়েকজন বন্ধু-বান্ধব দুপুর বেলা খালিহাতেই ছুটলাম সেদিকে। পথে দেখলাম, শ শ লোক চারদিক থেকে মার-মার, কাটকাট করতে করতে বিমান বন্দরের দিকে ছুটে যাচ্ছে। আমরা যখন রানওয়ের ওপর দিয়ে হেটে টার্মিনাল বিল্ডিংয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম তখন যেদিকে তাকাই সেদিকেই শুধু হাজার হাজার লোক আমাদের মতই এগিয়ে আসছে। ইতিমধ্যেই জড়ো হয়েছে প্রায় হাজার দশেক লোক। মনের মধ্যে উত্তেজনা আর ভয়ও কাজ করছে যদি পাকবাহিনী আমাদের দিকে গুলি ছোড়ে তাহলে কীভাবে সেটা আমরা মোকাবেলা করবো? মনে মনে হিসেব করছি আমরা যতো লোক জড়ো হচ্ছি আর্মির কাছে অতো গুলি থাকার কথা না। কাজেই সব লোক নিশ্চয়ই মারতে পারবে না, এক সময় না এক সময় ওরা ধরা পড়বেই। আমরা যখন রানওয়ের মাঝামাঝি পৌছে গেছি তখন শোনা গেল, পাকবাহিনী আত্মসমর্পন করেছে জনতার কাছে। একটা গাড়িতে করে ওদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে থানায়।

    খবরটা শোনামাত্রই সকলের মধ্যকার উত্তেজনা হঠাৎ করেই প্রশমিত হল। আমরা আবার শহরের দিকে ছুটলাম থানায় আটক পাকআর্মিদের দেখার জন্য। থানায় পৌঁছে দেখলাম লোকে লোকারণ্য। ভীড় ঠেলে বন্দীখানায় গিয়ে সত্যিই দেখা পেলাম ১০ জন সেনাকে। কিন্তু ওদের টীম-লিডার ছিলেন একজন বাঙ্গালী, ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন যিনি সেদিনের সেই আত্মসমর্পনের মুল পরিকল্পনা ও সহায়তাদানকারি।

    ২৯ মার্চ পাকবাহিনীর বিরাট একটি দল ঢাকা থেকে যমুনা নদী পার হয়ে নগরবাড়ি ঘাট হয়ে পাবনা শহর আক্রমণ করেছে। সেখানে বাঙ্গালী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ চলছে।

    আমরা বিকেলের দিকে ১৫ মাইল দূরে ঈশ্বরদী থেকেই পাবনায় বোমাবর্ষণের মত ভারী আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। সবার মধ্যেই টান-টান উত্তেজনা, নেতারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়; পরবর্তী করণীয় কী তা কেউ বলতে পারছেন না।

    পাবনার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বলতে গেলে বিচ্ছিন্ন, পুরো সড়কজুড়ে বড় বড় গাছ ফেলে, গর্ত খুঁড়ে গত কয়েকদিন ধরেই চলছিল বিচ্ছিন্নকরণের কাজ। সেদিন মাধপুরের চারাবটগাছ তলায় ঈশ্বরদীর কয়েক হাজার লোক সমবেত হয় পাকবাহিনীকে মোকাবেলা করার জন্য। এদের মধ্যে কিছু সংখ্যক আনছার, ইপিআর, পুলিশের কাছে ছিল সাদামাটা রাইফেল, জনতার মধ্যেও কারো কারো হাতে ঘরে রাখা বন্দুক। আর বাদবাকি লোকের কাছে তীর-ধনুক, ছুরি, বল্লম, সড়কি এমনকি কারো কারো হাতে ইট-পাটকেল, গুলতি, মাটির ঢিলও ছিল। পাকবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র বা তাদের শক্তি সম্পর্কে কারোই কোনো সঠিক ধারণা নেই।

    দুপুরের পর পরই পাকবাহিনীর সাজোয়া বহরটি পাবনার দিক থেকে অগ্রসর হয়ে মাধপুরে এসে বিরাট জনতার মুখোমুখি হয়। শুরু হয় উভয়পক্ষের মধ্যে প্রচন্ড গোলাগুলি। পাকিস্তানি বাহিনী সহজেই প্রতিরোধ ভেঙ্গে ফেলতে সক্ষম হয়, হতাহত হয় বহু মানুষ। পাক-আর্মিরা ঈশ্বরদী শহর বা পাকশির দিকে না গিয়ে দাশুড়িয়া হয়ে নাটোরের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাদের পিছু নেয়া থেকে তখনো পিছপা হননি। এভাবে সন্ধ্যা নাগাদ দাশুড়িয়া হাট, মুলাডুলি, রাজাপুরে আরো কয়েকদফা সংঘর্ষ বাধে। শেষদিকে নাটোর জেলার ময়না গ্রামে পাক-আর্মিরা আশ্রয় নিলে সে গ্রামও প্রতিরোধ যোদ্ধারা ঘেরাও করে এবং সারারাত এমনকি পরদিন বিকাল পর্যন্ত যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। আর এভাবেই পাকসেনাদের বহরটি সম্পুর্ণূরূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পাকিস্তানি সেনার দু’টি লাশ স্থানীয় লোকজন নাটোর রোডের পাশে গাছের ডালে বেধে ঝুলিয়ে রাখে বেশ কয়েকদিন।

    -লেখক অধূনালুপ্ত ‘দৈনিক বার্তা’ ও ‘দৈনিক বাংলার বাণী’র ঈশ্বরদী(পাবনা) সংবাদদাতা, ঈশ্বরদী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি (১৯৯২-‘৯৫)।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s


%d bloggers like this: